logo

তিনটি উপন্যাস

‘অপেক্ষা’, ‘পদশব্দ’ ও ‘টানাপড়েন’

সেলিনা হোসেন

‘তিনটি উপন্যাস।’ প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনে রচিত পূর্বে নানা সময়ে প্রকাশিত তিনটি উপন্যাসের সংকলন। ২০১৩ সালে এক মলাটে এই সংকলন প্রকাশ করে বেঙ্গল পাবলিকেশন্স।

tinti-uponashসংকলিত উপন্যাস তিনটি হলো ‘অপেক্ষা’, ‘পদশব্দ’ ও ‘টানাপোড়েন।’

‘অপেক্ষা’ উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। এটি মূলত মানব-মানবীর সম্পর্কের সন্ধিক্ষণের গল্প। সময়ের অপেক্ষায় মানুষ কীভাবে দিন গোনে, কীভাবে অপেক্ষমাণ সময় ধীরে ধীরে অন্যরকম সময়ে বদলে যায়, কীভাবে অপেক্ষার তৃষ্ণা নারীর জীবনকে ঘনীভূত করে সে গল্পই নারীবাদী বিশ্লেষণে এবং মনস্তাত্ত্বিক ভাবনায় উঠে এসেছে এই উপন্যাসে। অপেক্ষা করে অনিমা-কিন্তু তার অপেক্ষা যার জন্য তাকে পাওয়া আর হয় না। বাদ সাধে বাবা, বাবার ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করে অনিমা। মাধবী কুট্টি ভারতের কেরালার মেয়ে। ভালোবাসে তন্ময়কে, কিন্তু তন্ময় জানে ওর জন্য অপেক্ষায় আছে অনিমা। তারপরও মাধবী কুট্টি বলে যদি তোমার অপেক্ষার মানুষ আর তোমার অপেক্ষায় না থাকে, তাহলে আমার কাছে এসো। দিল্লিতে দেখা কিশোরী যৌনকর্মী তন্ময়কে বলে কয়েকটা টাকা পাব বলে আমি আপনার অপেক্ষায় থাকব। এই অপেক্ষার কোনো ব্যক্তিক সম্পর্ক নেই-তারপরও মানুষ মানুষের সঙ্গে এভাবে জীবনের অবস্থান খুঁজে নেয়। সম্পর্কের টানাপোড়েন অমলিন স্মৃতি হয়ে যায় অপেক্ষার মতো গভীর বিমূর্ত বোধে।

‘পদশব্দ’ উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত ১৯৮২ সালে। এই উপন্যাসের দুটি নারী চরিত্র, সালমা ও নাসিমার মাধ্যমে নারীর ব্যক্তিসত্তার মুক্তি-আকাঙ্ক্ষার চিত্র রূপায়িত হয়েছে। দুটি চরিত্রই চেষ্টা করেছে প্রচলিত প্রথাকে ভেঙে নিজেদের চারপাশের গণ্ডি পেরিয়ে বেরিয়ে যেতে। নিজেদের বিচার-বিবেচনা কাজে লাগিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিজেরাই। লেখক চান নারীরা শুধু নারী নয়, পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠুক। মানবসভ্যতার আদিতে নারী-পুরুষের লিঙ্গ-চেতনার তুলনায় প্রবল ছিল নিজেকে ‘মানুষ’ পরিচয়ে বিকশিত করার শ্রেয়বোধ। সভ্যতার অনিবার্য ক্রমবিবর্তিত ধারায় একসময় লিঙ্গভিত্তিক পরিচয় দানা বেঁধে উঠলেও বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসে নারী কিংবা পুরুষের পুনর্বার ‘মানুষ’ হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা শ্রেয়বোধ থেকে আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়েছে। পদশব্দ উপন্যাসটি লিঙ্গ-চেতনার জড়তা কাটিয়ে মানুষ হওয়ার আন্দোলনে সচেষ্ট হওয়ার শব্দশিল্প।

‘টানাপোড়েন’ উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে। এই উপন্যাস মানবসম্পর্কের জটিল সূত্র ধরে রচিত। প্রবল জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়া মানুষ হারায় তাদের প্রিয়জন। একজন বয়সী মানুষ সবাইকে হারিয়ে একা হয়। একজন তরুণী স্বামী-সন্তান হারিয়ে একা হয়। একটি শিশু সবাইকে হারিয়ে কুয়াকাটার সমুদ্রসৈকতে পড়ে থাকে। এই অপরিচিত তিনজন বেঁচে থাকার সূত্র ধরে এক হয়। আবার নিজেদের স্বার্থের প্রয়োজনে ভেঙে দেয় এই সম্পর্ক। রচিত হয় মানবিক ট্র্যাজেডির উপাখ্যান। এই উপন্যাস মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামের পাশাপাশি টানাপোড়েনের সম্পর্ককে শিল্পরূপ দিয়েছে। মানবিক দলিলের বিমূর্ত হওয়ার গল্প এই উপন্যাস।

 

rokomari

Leave a Reply