থেমেছে শহর
‘থেমেছে শহর।’ বেঙ্গল পাবলিকেশনস লিমিটেড থেকে প্রকাশিত এই ছোটো উপন্যাসটির লেখক শাহনাজ মুন্নী। তিনি ১৯৬৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে অনার্স, মাস্টার্স করেছেন। পেশায় টেলিভিশন সাংবাদিক, এখন পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত মোট বইয়ের সংখ্যা ২৩। লেখক হিসেবে তিনি কবিতা, গল্প, উপন্যাস, শিশু-সাহিত্য ও প্রবন্ধ লিখে থাকেন। ‘জ্বিনের কান্না,’ তাঁর প্রথম গল্পের বই, যেটি ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয়েছিল।
শাহনাজ মুন্নীর ভাষার সাবলীলতা পাঠকের মনে এক ধরনের আরামদায়ক অনুভূতির জন্ম দেয়। ক্যামেরার চোখের মতো গল্পের ধারাবর্ণনা করার এই প্রক্রিয়াটিতে নতুনত্ব আছে। তিনি সূক্ষ্ম সুঁচ দিয়ে গল্পের জাল বুনতে পারেন। প্লটের অভিনবত্ব তাঁর কথাসাহিত্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উপাদান।
‘থেমেছে শহর’ মূলত সাম্প্রতিক সময়ের পটভূমিকায় একই পেশায়, একই অফিসে কর্মরত দুই নারীর জীবনকে কেন্দ্র করে রচিত আখ্যান এটি। আনিকা আর মৃদুলা দুই প্রধান চরিত্র। তারা এই শহরেরই চলমান মানুষ। তাদের পাশাপাশি রয়েছে আরো কিছু সহযোগী চরিত্র। উপন্যাসটি বিস্তৃত হয়েছে এক বৃষ্টিশেষের গোধূলিতে দুই নারীর রিকশাভ্রমণকে কেন্দ্র করে। এতে রয়েছে ব্যক্তির প্রাত্যহিক জীবন, তার গোপন আকাঙ্ক্ষা ও প্রবৃত্তির দ্বন্দ্ব, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের হতাশা, প্রেম ও ব্যর্থতা, বাস্তব ও কল্পনার সংমিশ্রণ।
এই উপন্যাসে জীবনটাই যেন রূপান্তরিত হয়েছে শিল্পে। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক সংকট প্রকাশিত হয়েছে। ভাষার চমৎকারিত্বের গুণে শেষ পর্যন্ত পড়ে ফেলা যায় এক টানে, অনায়াসে। উপন্যাসের চরিত্ররা আমাদের আশপাশেই আছে। আমরা তাদের হয়তো চিনি, হয়তো না। বাইরে একজন মানুষের চেহারা যেমন দেখি ভেতরে হয়তো সে সম্পূর্ণ অন্যরকম। কখনো যদি এই শহর তার চলাচল থামিয়ে দেয়, তখন হয়তো সে নিজের মনের গোপন কথাটি অবলীলায় সঙ্গীকে জানিয়ে দেয়। কিন্তু বাস্তবে কি শহর কখনো থামে? শহর তো তার নিজস্ব নিয়মে চলতেই থাকে। তবু কখনো কখনো, কারো কারো কাছে শহর হয়তো সত্যিই থেমে যায়। আর থেমে থাকা শহরে ঘটে বিচিত্র সব ঘটনা।
লেখক চরিত্রগুলিকে নিজেদের মতো ছেড়ে দিয়েছেন উপন্যাসের পাতায়। তারাই কাহিনিকে টেনে নিয়ে গেছে সামনের দিকে। লেখকের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হচ্ছে তাঁর আখ্যানের প্রাসঙ্গিকতা, যেখানে পাঠক নিজেকে খুঁজে পাওয়ার আবিষ্কারে শেষ পর্যন্ত পড়ে যায়।
