বক ও বাঁশফুল
সাম্প্রতিক সময়ের বাংলা গল্পের অন্যতম কণ্ঠস্বর ওয়াসি আহমেদ। তাঁর গল্প সবসময় আমাদের সামনে গল্পের চেয়েও বেশি কিছু নিয়ে হাজির হয়। যা গল্পের সাধারণ বাস্তবতাকে অতিক্রম করে আরো বিশেষ কিছুকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করে। তাঁর সেসব গল্প দৈনন্দিন জীবনের সত্যকে গল্পের আকারে তুলে আনে তো বটেই কিন্তু কিছুটা বাঁকাভাবে এবং অতি অবশ্যই নিজস্ব বয়ানে। সেই ধারাবাহিকতায় তাঁর গল্পের ভাণ্ডারে আরেকটি সংযোজন ‘বক ও বাঁশফুল’ নামক গল্পগ্রন্থটি। যথারীতি এখানেও ওয়াসি আহমেদ গল্পের সত্যকে ধরতে চেয়েছেন নিজস্ব ঢঙে। যা রহস্যময়তা এবং বৈচিত্র্যে ভরা।ভাষা এবং বিষয়ের আবর্তে যে ঘোর এই কথাসাহিত্যিক নির্মাণ করেন তার রেশ রয়ে যায় অনেকদিন পর্যন্ত। এই বইয়ের প্রতিটি গল্প যেন ভিন্ন-ভিন্ন বাস্তবতায় একটা সমধর্মীয় ঐন্দ্রজালিক সুরে আবদ্ধ। বইয়ের নামগল্পটি যেটি আবার বইয়ের সূচনাগল্পও বটে, সেখানেই পাওয়া যায় সে রহস্যময় মায়ার সন্ধান। এই মায়া কেবল বিষয়বস্তুর মায়া নয়, যেখানে একজন মন্তাজের সামনে বাঁশঝাড়ের আদলে হাজির হয় তার অতীত। সে অতীত থেকে তাকে বাঁচানোর লড়াইয়ে তার সঙ্গী হয় একদল বক। তারাও চালিয়ে যায় নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আর এই বিষয়কে আরো বেশি নান্দনিক করে তোলে ওয়াসি আহমেদের মায়াময় ভাষা এবং নিজস্ব বয়ান ভঙ্গি। নামগল্পটা শুরু হয় এভাবে, ‘সূর্য ডোবার আগে আগে বকের ঝাঁক ফিরে আসতে বাঁশঝাড়ের কুঁজো মাথাগুলো ফকফকে সাদা।’ ওয়াসি আহমেদের ভাষাভঙ্গি এই গল্পে অনেক ক্ষেত্রে কবিতার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ায়। তবে তা অবশ্যই কবিতা নয়।তাঁর গল্প আমাদের সামনে গল্পকেই হাজির করে। ‘আলী দোস্ত বৃত্তান্ত’ নামক গল্পে ঐতিহাসিকতার আড়ালে আমাদের সামনে এক মানবিক গল্পই বলেছেন লেখক। আরেক গল্প ‘মুগ্ধতার কারসাজি’ মূলত দুই রিটায়ার্ড অধ্যাপক দম্পতি মনজুর হাসান এবং শাহানা হাসানের। যারা অনেকদিন ধরেই একই ছাদের নিচে বাস করলেও দুজনের দৃষ্টিভঙ্গিগত অমিল এবং একই ঘটনায় তাদের ভিন্ন ভিন্ন উপলব্ধিকে তুলে ধরেছেন লেখক। ‘গিলবার্ট’ গল্পটি মূলত একজন বিদেশিকে নিয়ে। অপেক্ষাকৃত সহজ বয়ানে রচিত এই গল্পে ওয়াসি আহমেদ গিলবার্ট নামক এক অস্ট্রেলিয়ান নাগরিকের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ এবং তার সৌন্দর্যকে সামনে এনেছেন। সেইসাথে ‘মা’ নামক শাশ্বত এক সম্পর্কের সাথে গিলবার্টের জড়িয়ে যাওয়ার মানবিক আখ্যানও লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন নান্দনিকভাবে। আবার সেই তুলনায় পরের গল্প ‘খেলাধুলা’ একটি পলিটিক্যাল স্যাটায়ার। যেখানে হাসান জামিল নামক এক অধ্যাপক টকশো বুদ্ধিজীবী এবং যিনি পরবর্তীতে টকশো সেলিব্রেটিতে পরিণত হন। তার এই সেলিব্রেটিশিপের যে বিড়ম্বনা ও ট্র্যাজেডি তা-ই মূলত এ-গল্পের আলোচ্য বিষয়। সেইসাথে এ-গল্পটি বতর্মান সময়ের বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর চরিত্রকে বুঝতে চাওয়ার প্রয়াসও বটে। এছাড়া ‘গুম হওয়ার আগে ও পরে’, ‘জ্বালা,’ ‘হাওয়া মেঘের পালাবদল কিংবা পাঙাসের চাষবাস,’ ‘আঁধার’ অথবা ‘আকুলের শেষ জবানবন্দি’ – এই গল্পগুলোও কখনো চমকপ্রদ ভাষা, আবার কখনো রহস্যময় বয়ান কিংবা স্যাটায়ারের মাধ্যমে আমাদের ভেতরটাকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। মোট দশটি গল্প দিয়ে সাজানো হয়েছে এ-বই। যার প্রতিটি গল্প আলাদা হলেও তাদের সুর যেন একই সমান্তরালে একটি মানবিক বিশ্বের গল্পই আমাদের শোনাতে চায়।
