শিস ও অন্যান্য গল্প
শাহীন আখতার প্রায় দু-দশক ধরে উপন্যাসের পাশাপাশি গল্প লিখে আসছেন। তাঁর গল্পের বিষয়, পরিবেশ ও চরিত্ররা প্রাণশক্তি নিয়ে পাঠকের সামনে হাজির হয়। তাঁর গল্পপাঠে পাঠক কখনো ক্লান্তিবোধ করেন না। সমকালীন পাঠকের কাছে একজন গল্পকারের নিজেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে দাঁড় করানো সহজ ব্যাপার নয়। কেননা, সমকাল দূরবর্তী আলোয় উদ্ভাসিত হয় অনেক ক্ষেত্রে। তবে শাহীন আখতার ব্যতিক্রম বলা যায়, তাঁর গল্প সৃষ্টির স্বাতন্ত্র্য মহিমায়। ‘শিস ও অন্যান্য গল্প’ তাঁর স্বাতন্ত্র্যধর্মী শিল্পীসত্তার স্বরূপ নির্ধারণে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
এই গল্পগ্রন্থে গল্পসংখ্যা ১০টি। গল্পগুলো হলো- ‘শিস’, ‘তাজমহল’, ‘আমবাগানের সখা’, ‘হাতপাখা’, ‘আসতান’, ‘আবারও প্রেম আসছে’, ‘সাপ, স্বামী, আশালতা ও আমরা’, ‘মেকআপ বাক্স’, ‘পাঁচটা কাক ও একজন মুক্তিযোদ্ধা’, ‘বোনের সঙ্গে অমরলোকে’। তাঁর গল্পের সময়, সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, নাগরিক পরিবেশ, নাগরিক মনোলোক, গ্রামীণ ও নাগরিক চরিত্রের নানা বর্ণবৈচিত্র্য ও জীবনের বাস্তবতাকে এমনভাবেই স্পর্শ করেছে- যা তাঁর নিজস্ব সহৃদয়তা ও সৃজনশীলতাকেই প্রকাশ করেছে।
‘শিস’ গল্পটির পটভূমি নগরজীবন; গ্রামজীবনও আছে, তবে তা খুবই সামান্য পরিসরে, প্রাসঙ্গিকক্রমে এসেছে। নাগরিক জীবনে নাগরিক মানসিকতাকে, নাগরিক অধঃপতনকে, নাগরিক গোপনীয়তাকে যে সবাই প্রশ্রয় দেয় না, আবার অনেকে প্রশ্রয় দিয়ে খুব স্নেহের সঙ্গে সে-প্রশ্রয়কে লালন করে- এই উভয়বিধ মানুষের উপস্থিতি রয়েছে ‘শিস’ গল্পে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ গল্প ‘পাঁচটা কাক ও একজন মুক্তিযোদ্ধা’। মুক্তিযুদ্ধের গল্প হিসেবে এটি গতানুগতিক ধারার নয়। জীবনের, যুদ্ধের ভয়াবহ রূপ এই গল্পে নেই সত্য, প্রত্যক্ষভাবে বন্ধুর হাতে কোনো মুক্তিযোদ্ধার সম্মুখযুদ্ধ বা গেরিলা যুদ্ধেরও উপস্থিতি নেই, তারপরও এমন একজন মুক্তিযোদ্ধার কথা গল্পে উঠে এসেছে- যার ভূমিকার ফলে মুক্তিকামী কয়েকটি মানুষের প্রাণ বেঁচে যায়, বেঁচে যাওয়া মানুষগুলো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য আশ্রয় নিতে ছুটে যায় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। ব্যতিক্রম শুধু গল্পকারের আব্বা।
মৃত্যুচিন্তা নিয়ে কবিতা প্রচুর লেখা হয়েছে। গল্পও তুলনামূলকভাবে কম লেখা হয়নি। তবে মৃত্যুচিন্তা বা ভাবনায় প্রত্যেক কবি ও গল্পকার বা অন্যান্য লেখকের রয়েছে নিজস্ব দর্শন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর গল্পে মৃত্যুর আলোকে মানবজীবনের মূল্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন, চেতনায় ধারণ করে নবজীবনের আশ্বাস ব্যক্ত করেছেন। শাহীন আখতারের মৃত্যুভাবনার স্বরূপ উপলব্ধি করা যায় ‘বোনের সঙ্গে অমরলোকে’ গল্পের ভেতর দিয়ে। গল্পটি অস্থিবাদী চেতনার কথাও মনে করিয়ে দেয়। মৃত্যুর ভেতর দিয়েও নিজের অস্তিত্বকে উপলব্ধি করতে চান শাহীন আখতার। অনেকে হয়তো এভাবেই নিজেকে অস্তিত্বশালী করতে চান মৃত্যুর পরও। আর মৃতুটাকেই অমরলোক হিসেবে ভাবতে ও প্রতিষ্ঠা দিতে প্রত্যাশী হোন।
শাহীন আখতারের গল্পে শিল্পরসের রয়েছে নানা প্রবণতা। ফোকলোর প্রবণতা অন্যতম। হাতপাখা’ তাঁর ফোকলোরকে ধারণ করে রচিত গল্প। একজন বেশ্যা খুন হওয়ার পর তার লাশ কবর দেওয়া পর্যন্ত ঘটে যায় কিছু অমানবিক ঘটনা- সঙ্গে সঙ্গে মানবিক ঘটনা। এসব ঘটনা নিয়েই গল্প ‘মেকআপ বাক্স’। বিচিত্রধর্মী ও ‘পরস্পর বিচ্ছিন্ন’ মানুষের দেখা মেলে শাহীন আখতারের গল্পগুলোতে। ফলে ঐতিহ্যের সঙ্গে উত্তরাধিকারের সমন্বয় সাধন করে গল্প রচিত হলেও সময়ের সঙ্গে জীবন বাস্তবতার যে অসংগতি তাকে নতুনভাবে শিল্পমণ্ডিত করেছেন তিনি।
