পুষ্পিত ফরাশ ও বেগুনি জ্যোৎস্না
ভ্রমণপিপাসু পাঠকদের জন্য অসাধারণ একটি সংগ্রহ হতে পারে সাহিত্যিক মঈনুস সুলতানের ‘পুষ্পিত ফরাশ ও বেগুনি জ্যোৎস্না’ গ্রন্থটি। এখানে বেলজিয়াম ও প্যারিসের বিভিন্ন স্থানের অসাধারণ সব বর্ণনার পাশাপাশি রয়েছে জনজীবনের একটি অনুন্মুক্ত রূপ, যা পৃথিবীর কাছে রঙিন পর্দার আবরণে ঢাকা। প্রতিটি স্থানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে লেখকের নিজস্ব অভিব্যক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গির অদ্ভুত সমন্বয়। ভ্রমণগ্রন্থ হয়েও এতে ফুটে উঠেছে পৃথিবীর এক বিরূপ বাস্তবতা। রোগের সংক্রমণ আর মানুষের নৃশংস আচরণের কাছে পরাজিত হয়েছে মানবিকতা। ব্যথাতুরা পৃথিবীর একটি ভিন্ন রূপ লেখক অঙ্কন করেছেন গ্রন্থটিতে। চিরাচরিত পৃথিবীর বাইরে তাই ‘পুষ্পিত ফরাশ ও বেগুনি জ্যোৎস্না হয়ে উঠেছে ভিন্ন এক পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি।
মানুষের পলায়নপর মানসিকতা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় প্রতিনিয়ত। শঙ্কাহীন জীবনের সন্ধানে তারা পাড়ি জমায় দেশ থেকে দেশান্তরে; কিন্তু চিরসাথির মতো প্রতিটি স্থানেই আশঙ্কা তাদের পিছু ছাড়ে না। লেখক মঈনুস সুলতান সিয়েরালিওন থেকে ইবোলার সংক্রমণ রোধে পাড়ি জমান বেলজিয়ামে। সেখানে ব্রাসেলসে কিছুদিন কাটিয়ে যান ফ্রান্সে। বেলজিয়াম ও ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণের সঙ্গে সঙ্গে তার চলার সাথি হন বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সুবাদে লেখক দেখতে পান পৃথিবীর কাছে আড়ালকৃত শহরের জীবন। মানুষের একাকিত্ব, পেশার ভিন্নতা আর নিয়ত পরিবর্তনশীল মনুষ্য চরিত্র। এ-গ্রন্থে তিনি বিভিন্ন স্থানের মানুষের, বিশেষ করে নারীদের, পোশাক-পরিচ্ছদ, আচরণ ও মানসিকতাকে তুলে ধরেছেন। পাঠকের সামনে উন্মুক্ত করেছেন বিদেশে প্রচলিত লোকচক্ষুর আড়ালে পরিচালিত অবৈধ সব ব্যবসাকে। শুধু স্থানের মনোহর বর্ণনাই নয়, এখানে সংযুক্ত হয়েছে নাম না জানা বাহারি অসংখ্য খাবারের নাম, মূল্যবান পাথরের নাম আর অবাক করা সব স্থাপত্যশিল্পের বর্ণনা।
গ্রন্থটির শুরুর দিকে লেখক দিচ্ছেন ইবোলা-আক্রান্ত সিয়েরালিওন থেকে বেরিয়ে ব্রাসেলস বিমানবন্দরে তার অভিজ্ঞতার পরিচয়। সেখানে প্রবেশ করতে গিয়ে তাঁকে সম্মুখিন হতে হয় কঠিন নজরদারির। তিনি ইবোলায় আক্রান্ত দেশটির মানুষের করুণ পরিণতি তুলে ধরেছেন বিভিন্নভাবে। নিজেকে ভেবেছেন বিশ্বাসঘাতক। বলেছেন, ‘আমার এ পলায়ন কি তাদের সামান্য সেবাদানের অঙ্গীকারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা নয়?’ তিনি যখন দেশ ছাড়েন, তখন সেখানে ইবোলায় প্রাণ হারিয়েছে হাজারখানেক মানুষ। একের পর এক লেখকের পরিচিত মানুষেরাও এতে আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন তার বাড়ির চাকর আলী মানসরাইয়ের পরিবার। তিনি শুধু দেখেছেন ‘বিমর্ষ সুরে সাইরেন বাজিয়ে অ্যাম্বুলেন্স যাচ্ছে তাদের বস্তির দিকে।’ খাদ্যের অভাবে অসহায় মানুষগুলোর দুর্বিষহ যন্ত্রণা তিনি সঞ্চারিত করেছেন পাঠকের মধ্যেও।
এরপরই লেখক প্রবেশ করেন মূল ভ্রমণবৃত্তান্তে। ‘মাতংগি ও ফ্লোরাল কার্পেট’ শিরোনামে তিনি তুলে ধরেন ব্রাসেলসের অভিনব সব দৃশ্যপট। পদে পদে তিনি বর্ণনা করেন বিচিত্রসব বিষয়ের। যেমন : কৃষ্ণাঙ্গ-অধ্যুষিত কিনসাসা শহরের বর্ণনায় তিনি বলছেন, ‘সবাই কঙ্গোলিজ ভাষায় কথা বলছে, হাঁকডাক করে বিক্রি হচ্ছে তাজা মাছ, কমলালেবু, সাপখোপ ও বুনো জীবজন্তুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বয়ামভর্তি আচার।’ চমৎকার সব শিরোনামে তিনি সাজিয়েছেন প্রতিটি বিষয়কে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রয়েছে স্থানের নাম যেমন : ‘ব্রাসেলসের ট্রাম ও গৃহহীন মানুষ’, ‘ইংলিশ গার্ডেন বাতিগ্এলস স্কয়ার’, ‘তামিল টাউন’, ‘হোটেল ডে আর্টস’, ‘মোঁমাতে ওয়াকিং ট্যুর’, ‘বেসিলিকার শুভ্র পাথরের ডোম’, ‘ক্যাফে প্রকোপে’, ‘ক্যান্ডল লাইট কর্নার’ ইত্যাদি। আবার কোনোটায় ব্যক্তির নাম তিনি স্থাপন করেছেন আকর্ষণীয়ভাবে। যেমন : ‘পিনোলোপে ম্যাকবয় ও নানোমি আলগালি’, ‘টিমবাকটু ও অ্যাডেলিনার সাতকাহন’, ‘বয়স্ক হিপি রেমন্ড ও চিত্রকর ভেরোনিকা’ ইত্যাদি নাম দারুণভাবে আকর্ষণ করে পাঠককে আর সে-চরিত্র সম্পর্কে অবগত হতে পাঠককে সাঁতরাতে হয় লেখকের তৈরি শব্দসমুদ্রে। কোথাও আবার তিনি দৃষ্টি আকর্ষণে শিরোনামে ব্যবহার করেছেন অদ্ভুতসব অনুষঙ্গ। যেমন : ‘বাস্তিল ডের বিভ্রান্ত অভিসার’, ‘হালফ্যাশনের বজরায়’, ‘ছাগল ও বাঁধাকপির ঠেক’, ‘টাকুগামার ছনের বাংলো’ ইত্যাদি। শিরোনামগুলোর মাধ্যমে পাঠক ভেতরের বিষয় সম্পর্কে জানার আগ্রহ পান।
ভ্রমণগ্রন্থ মানেই নতুন পৃথিবীর স্বাদ, নতুন নতুন অদেখা বাস্তবতার সম্মুখীন হওয়া। লেখক মঈনুস সুলতান তাঁর পুষ্পিত ফরাশ ও বেগুনি জ্যোৎস্না গ্রন্থে পাঠককে পরিচয় করিয়ে দেন এমনই এক অদেখা পৃথিবীর সঙ্গে।
