বেঙ্গল পাবলিকেশন্‌‌স

আমেরিকার আদিবাসীদের লোককাহিনি

Price
300 BDT

Published on
Dec 2024

ISBN
978-984-98198-8-2

Category

অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে, সুদূর অতীতের বিভিন্ন সময় সাইবেরিয়ার পূর্বপ্রান্ত থেকে মানুষ জলপথে বেরিং প্রণালি অতিক্রম করে আলাস্কার পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত কেপ প্রিন্স অব ওয়েলস্-এ পৌঁছেছিল। বেরিং প্রণালির সেই পথ মাত্র চল্লিশ মাইল।
আমেরিকার আদিবাসীদের দৈহিক গঠন, গায়ের রং, চুলের ধরন ও উপস্থিতি, মুখাবয়ব, হেলানো চোখ (slanting eye) ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে এশিয়ার উত্তর-পূর্বাংশের মঙ্গোলয়েড মানুষের সাদৃশ্য রয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, পনেরো থেকে বিশ হাজার বছর আগে এশিয়া থেকে বেরিং প্রণালি দিয়ে আমেরিকায় দেশান্তর শুরু হয়েছিল এবং বিভিন্ন সময়, হতে পারে একশ বছরের ব্যবধানে, বিভিন্ন গোষ্ঠী এ-অঞ্চল পাড়ি জমায়।
উল্লেখ্য, বিভিন্ন সময়ে আগত মানব গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতিতে পার্থক্য ছিল। সময়ের ব্যবধানে পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে এই পার্থক্য বড় আকার ধারণ করে এবং তা বিকশিত হয়। ফলে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ভাষা, আচার-অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতির উদ্ভব পরিলক্ষিত হয়। কেবল উত্তর আমেরিকায় প্রায় ৫০০ আদিবাসী গোত্র ছিল। তারা ২৯টি ভাষা পরিবারের (language family) অন্তর্গত প্রায় ৩০০ ভাষায় কথা বলত। কেবল ব্রিটিশ কলাম্বিয়া অঞ্চলের আদিবাসীদের পাঁচটি স্বতন্ত্র ভাষা ছিল। সেই ভাষার মধ্যে যে পার্থক্য তা স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ ভাষার মধ্যে যে সামান্য পার্থক্য সেরকম নয়। বরং ইংরেজি ও চীনা ভাষার মধ্যে যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে, সেরকম!
আমেরিকার আদিবাসীদের ভাষাগুলোর মধ্যে ব্যাকরণের ভিত্তি হচ্ছে কল্পনা বা ধারণা। বিভিন্ন ভাষায় উপসর্গ (Prefix) ও প্রত্যয় বিভক্তির (Suffix) ব্যবহার খুব বেশি। কখনো মূল একটা শব্দের সঙ্গে অনেকগুলো উপসর্গ ও প্রত্যয় যুক্ত করে অর্থ প্রকাশ করা হয়, যেমন — টিনগিট গোত্রের ভাষায় ‘উত্তর মেরুর আকাশে দৃষ্ট বর্ণালী আলো’কে Kanyiqkuwate বলা হয়। এখানে প্রধান শব্দ হচ্ছে কধহ, যার অর্থ আগুন; এর সঙ্গে তিনটি প্রত্যয় —
yiq (সদৃশ), ku (ঘরের বাইরে) এবং wate (রং) যোগ করা হয়েছে। অতঃপর Kanyiqkuwate শব্দটির অর্থ দাঁড়াচ্ছে, ‘ঘরের বাইরে আগুনসদৃশ রঙিন বস্তু’।
আমেরিকার আদিবাসীদের ভাষার জটিলতার কারণে গভীর মনোযোগ দেওয়া সত্ত্বেও কোনো ইউরোপীয় ব্যক্তির পক্ষে তাদের ভাষা পুরোপুরি রপ্ত করা সম্ভব হয়নি।
ভাষাগুলোর পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন আদিবাসীর মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল না। কারণ ভিন্ন গোত্রের মধ্যে বিয়ে ও সামাজিক সম্পর্ক অব্যাহত ছিল। তাছাড়া যুদ্ধবন্দিরা বন্দিকারীদের কাছ থেকে কিছু ভাষা শিখে নিত। অধিকন্তু প্রেইরি অঞ্চলের আদিবাসীরা সংকেত ভাষা (Sign Language) ব্যবহারে দক্ষ ছিল। সংকেত ভাষায় অভিজ্ঞ ব্যক্তি মুখে কোনো শব্দ উচ্চারণ না করে কেবল হাত ও আঙুলের ইশারায় মনের যে কোনো ভাব প্রকাশ করতে পারত এবং অপর ব্যক্তির তা উপলব্ধি করতে কোনো অসুবিধা হতো না।
সাধারণত শীতকালে রাতে আগুনের চারপাশে বসে আদিবাসী বৃদ্ধ নারীরা শিশু-কিশোরদের গল্প শোনাত। কোনো গল্প এত দীর্ঘ হতো যে, এক রাতে তা বলে শেষ করা যেত না। গল্পগুলো রাতের বেলায়ই বলা হতো। অমঙ্গলের আশঙ্কায় কোনো কোনো গোত্রে দিনে গল্প বলা নিষেধ ছিল।
আমেরিকার অসংখ্য আদিবাসী গোত্রের মধ্যে কারো লিখন পদ্ধতি ছিল না। তাই তাদের নিজের লিখিত কোনো কাহিনি, উপকথা বা ইতিহাস নেই। কিন্তু তাদের মৌখিক লোককাহিনির ভাণ্ডার ছিল সমৃদ্ধ এবং তা লোকমুখে বংশপরম্পরায় হাজার হাজার বছর ধরে প্রবাহিত হয়ে এসেছিল।
কতিপয় ইউরোপীয় অভিবাসী লোকসাহিত্যিকের একান্ত প্রচেষ্টায় আমেরিকার আদিবাসী লোককাহিনি চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার পথ থেকে রক্ষা পেয়েছে। তাঁরা অত্যন্ত ধৈর্যসহকারে আদিবাসীদের কাছ থেকে যথাযথভাবে শুনে লোককাহিনিগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন। লোকসাহিত্য সংগ্রাহকদের মধ্যে কর্নেলিয়াস ম্যাথিউজ (Cornelius Matthews), জিটকালা-সা (Zitkala-Sa), সাইরাস ম্যাকমিলান (Cyrus MacMillan) প্রমুখ অন্যতম।
অধিকাংশ লোককাহিনির কেন্দ্রীয় চরিত্রে আপন মহিমায় শক্তিমান বিভিন্ন স্পিরিট অর্থাৎ অদৃশ্য সত্তা। আমেরিকার আদিবাসীরা বিশ্বাস করত যে, পানির স্পিরিট জলাশয়ের সকল জীব নিয়ন্ত্রণ করে, স্থলের স্পিরিট
ভূ-ভাগের সকল জীব নিয়ন্ত্রণ করে এবং বনের স্পিরিট বনের জীবগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই তারা নিজের সুখ-শান্তির জন্য সব সময় স্পিরিটদের সন্তুষ্ট রাখতে চেষ্টা করত। কিছু লোককাহিনির বিষয় হচ্ছে কীভাবে পৃথিবী সৃষ্টি হলো, পাখিরা কীভাবে নানা বর্ণ লাভ করল, র‌্যাভেন পাখি কেন কালো ইত্যাদি। কিছু লোককাহিনিতে ফুটে উঠেছে নীতিকথা। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ভেতরের অঞ্চলের লোককাহিনিতে রয়েছে কিছু সামাজিক বিশ্বাস, যেমন আমরা অতিথিদের আপ্যায়ন করব, বৃদ্ধ ও গরিবদের পরিহাস করব না ইত্যাদি। বিভিন্ন অঞ্চলের লোককাহিনিতে নানা সংস্কারের উপস্থিতিও লক্ষণীয়।
লোককাহিনিগুলো মূলত পবিত্র ও আধ্যাত্মিক বিষয়, ধর্মীয় ও সামাজিক আচার ও শিষ্টাচার বিষয়ক। এগুলো আমেরিকার আদিবাসী পূর্বপুরুষদের জীবনধারা ও সংস্কৃতির চমৎকার প্রতিচ্ছবি ধারণ করে।
—মো. আজিজুর রহমান লসক্‌র



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *