বেঙ্গল পাবলিকেশন্‌‌স

দেখা না-দেখায় মেশা: ইতিহাসের বিচিত্র কাহিনি

Price
290 BDT

Published on
JUne 2015

ISBN
9789849162261

Category


যে-কোনো যুগের কিংবা ভূখণ্ডের ইতিহাসের প্রচলিত ধারাবাহিক লিখিত বিবরণের বাইরেও অনেক বিখ- উপাদানকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ‘ইতিহাসের চূর্ণ’, যা সাধারণত আমাদের নজরে পড়ে না। বড়-বড় ঘটনার নিচে চাপা পড়া এসব খ-িত ও পার্শ্বকাহিনি ইতিহাসের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চায় কমই ধরা পড়ে বেশিরভাগ সময়। কিন্তু এরকম অনেক ঘটনা বা কাহিনি থেকে অতীতের সমাজ ও সংস্কৃতির এক ভিন্নরকম চালচিত্র উদ্ধার করা সম্ভবও বইকি। সেরকম এক প্রচেষ্টারই অনুপম নিদর্শন মাহবুব আলমের প্রবন্ধগ্রন্থ ‘দেখা না-দেখায় মেশা : ইতিহাসের বিচিত্র কাহিনি’। লেখক বইটির মুখবন্ধে জানিয়েছেন, প্রচলিত ইতিহাসের মূলধারা বাইরে থাকা টুকরো মণি-মাণিক্যের সন্ধানই এখানে লভ্য। এসব ঘটনা সময়ের ভাঙাগড়ার কুটিল গতির কারণে সেভাবে দৃশ্যমান না হলেও তা নীরবেই ইতিহাসের গতিবিধিতে রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস-সংশ্লিষ্ট সেরকম কিছু ঘটনারই আদ্যোপান্ত তিনি এখানে সরস ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন।

এবার বইটিতে অন্তর্ভুক্ত বারোটি প্রবন্ধের দিকে নজর দেওয়া যাক। প্রথম প্রবন্ধ ‘শায়েস্তা খান ও বিদেশি জহুরি’ বাংলার একসময়ের মোগল সুবেদার শায়েস্তা খানের জীবনের এক কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনার দিকে আলোকপাত করেছে। ব্যক্তিজীবনে মিতব্যয়ী হিসেবে খ্যাতিমান ছিলেন তিনি, আবার মাত্র একটি শখের জন্যে প্রচুর অর্থব্যয়েও কার্পণ্য করতেন না। এই শখের সূত্র ধরেই ফরাসি পর্যটক ও রত্নব্যবসায়ী তাভারনিয়ারের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। যখন তিনি গুজরাটের সুবেদার ছিলেন, তখনই তাভারনিয়ারের কাছ থেকে তিনি রত্নপাথর কেনা শুরু করেন। পরস্পরের মধ্যকার এ-যোগাযোগ এক যুগেরও বেশি সময় স্থায়ী হয়েছিল। অন্যসব কর্মের মতো রত্নক্রয়ের ব্যাপারেও শায়েস্তা খানের আচরণ ছিল সমঝদারসুলভ, যাচাই-বাছাই করেই তিনি রত্ন কিনতেন।

মোগল ইতিহাসের আরেকটি চমৎকার খ-চিত্র লভ্য ‘গুরু-শিষ্য সম্বাদ’ শীর্ষক রচনাটিতে। শিরোনামে উল্লিখিত শিষ্য হলেন মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব, আর গুরু তাঁর কৈশোরের শিক্ষক মোল্লা সালিহ। দিল্লির সম্রাট হওয়ার পর গুরুর প্রতি শিষ্য এক উত্তপ্ত অথচ যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য ছুড়ে দিয়েছিলেন, তারই সারাংশ এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে। দিল্লির সিংহাসনকে ঘিরে গৃহযুদ্ধ যখন সমাপ্ত, তখন মোল্লা সালিহ জানতে পারলেন, তাঁর প্রাক্তন শিষ্য আওরঙ্গজেবই হয়েছেন দিল্লির বাদশাহ। মোল্লাজি অতঃপর দিল্লির পথে যাত্রা শুরু করেন এই আশায় যে, ছাত্রের কাছ থেকে শাহি দরবারে তিনি উপযুক্ত সম্মাননাই লাভ করবেন। দিল্লিতে আসার প্রায় তিন মাস পর তিনি একান্তে বাদশার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি পেলেন। গুরু-শিষ্যের আলাপ শুরু হলো। কিন্তু আওরঙ্গজেব হয়ে উঠলেন সমালোচনামুখর। তাঁর শৈশবের শিক্ষক তাঁকে ইতিহাস-শিক্ষা দিতে গিয়ে কী কী ভুল তথ্য দিয়েছিলেন ও বিভ্রান্তিকর দীক্ষা দিয়েছিলেন সেসবের বিস্তারিত ফিরিস্তি তিনি দিলেন। এভাবে তাঁর গুরুর শিক্ষাদানের পদ্ধতির ত্রুটিগুলো একের পর এক চিহ্নিত করে চললেন মোগল সম্রাট। তবে আত্মপক্ষ সমর্থনে মোল্লা সালিহ কোনো বক্তব্য রাখেননি বলে জানা যায় ফরাসি পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়েরের বই থেকে।

সেকালে বাঙালির ফারসি ও ইংরেজি ভাষা শেখা এবং ইংরেজ সাহেবদের বাংলা শেখা নিয়ে তথ্যপূর্ণ তিনটি প্রবন্ধ বইটির বড় সম্পদরূপে বিবেচিত হবে বলে মনে করি। ‘সেকালের বাঙালি পড়–য়ার ফারসি শেখা’তে সুলতানি আমল থেকে উনিশ শতকের শেষার্ধ অবধি বাঙালিদের মধ্যে ফারসি শেখার যে চল ছিল, তা নিয়ে সবিস্তার আলোচনা রয়েছে। ‘সেকালের বাঙালির বাবু-ইংলিশ’ প্রবন্ধটি ইংরেজ-অধিকৃত তৎকালীন বঙ্গদেশে স্বার্থ-উদ্ধারহেতু বাঙালির ইংরেজি শেখার তৎপরতার যুগপৎ কৌতূহলোদ্দীপক ও কৌতুকপূর্ণ বর্ণনায় সমৃদ্ধ। শাসনকার্যে স্বাচ্ছন্দ্য আনার লক্ষ্যে অধীনস্থ বাঙালি জনতার ভাষা শিখতে গিয়ে  উনিশ শতকের বাংলায় আসা ইংরেজদের নানাবিধ কসরতের নমুনা ও তাদের বাংলা শেখার প্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি বিবরণ রয়েছে ‘সেকালের সাহেবের বাংলা শেখা’ রচনায়। সে-সময় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিষবৃক্ষ উপন্যাসের প্রথম ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন এক ইংরেজ ভদ্রমহিলা, মিরিয়াম নাইট। কিন্তু আন্তরিকতা নিয়ে বাংলা শিখলেও তিনি কিছু হাস্যকর ভুল তাঁর অনুবাদে এড়িয়ে যেতে পারেননি। যেমন, ‘গোপালউড়ের যাত্রা’ কথাটির আসল মানে না বুঝতে পেরে তিনি এর অনুবাদ দাঁড় করিয়েছিলেন দ্য জার্নি অব ফ্লাইং গোপাল!

উপনিবেশ আমলের ভারতের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে রচিত একাধিক অমøমধুর স্বাদের প্রবন্ধ বইটিতে মিলবে। লর্ড ডালহৌসির কূট-তৎপরতার কারণে ভারতবর্ষের অমূল্য হীরা কোহিনূর কেমন করে ইংল্যান্ডে পাচার হয়ে গেল লেখক ‘কোহিনূর কীভাবে বিলাতে পাচার হলো’ প্রবন্ধে দক্ষ গল্পবলিয়ের মতো সেই কাহিনির ঘটনাপ্রবাহের পূর্বাপর বয়ান করেছেন। একটি রহস্যমাখা ঘটনা হলো সিপাহি বিপ্লবের পর বিদ্রোহী নানা সাহেবের উধাও হয়ে যাওয়া। ‘নানা সাহেবের অন্তর্ধান রহস্য’ লেখায় নানা সাহেবের এই অদৃশ্য হওয়ার কাহিনি ও তাঁর শেষ পরিণতি কী হয়েছিল সে-বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এ-কথা ভেবে অবাকই লাগে যে, নানা সাহেব নেপালে মারা গিয়েছেন এই তথ্য ইংরেজ প্রশাসনের অনেকেই যুক্তিসংগত কারণে বিশ্বাস করতেন, কিন্তু তাও গোয়েন্দাগিরির নাম করে বিনা পরিশ্রমে পয়সা বাগানো যাবে ভেবে চতুর-অসাধু কর্মকর্তারা নানা সাহেবের অনুসন্ধানকল্পে বিভিন্ন প্রকল্প বহু সময় ধরে চালু রেখেছিলেন।  ‘লাট সাহেবের সেই রুমাল’ তুলে ধরে বাংলার রেশমশিল্পের এক অজানা অধ্যায়ের কথা লর্ড কারমাইকেল গত শতকের প্রথমার্ধে বাংলা প্রদেশের গর্ভনর হয়ে কলকাতায় আসার পর খুঁজছিলেন এক বিশেষ ধরনের রেশমি রুমাল, যা তিনি বিলাতে থাকার সময় এডিনবরা শহরের এক দোকান থেকে কিনতেন। কিন্তু গোটা ভারতের কোথাও তেমন রুমালের খোঁজ পাওয়া গেল না। অবশেষে একদিন খবর মিলল, আদতে বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলাতেই ওই রুমাল তৈরি হয়ে থাকে ও পরে তা বিলাত এবং ইউরোপের নানা দেশে রফতানি হয়ে যায়। লর্ড কারমাইকেল এমন তথ্য পেয়ে ওই রুমালের কারিগরকে দেখতে চেয়েছিলেন। পরে তিনি নিজেই মুর্শিদাবাদ সফরে গিয়ে রুমালের নির্মাতা আবদুলের সঙ্গে দেখা করেন ও তাঁকে একজোড়া সোনার মোহর উপহার দেন।

ঢাকা শহরকে ঘিরে দুই মহারথীর সফর ও বসবাসের আখ্যান পাই দুটি দীর্ঘকায় লেখায়। একালের পাঠক ওই প্রবন্ধদ্বয় থেকে দুই খ্যাতনামা ব্যক্তির জীবনের নানা চালচিত্র ও দুই ভিন্ন আমলের  ঢাকার অচেনা রূপ সম্পর্কে অবহিত হতে পারবেন। ১৯২৫-এর এপ্রিলে ও ১৯৩৬-এর জুলাইয়ে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এসেছিলেন ঢাকা শহরে সেই দুই সফরের সবিস্তার ইতিবৃত্ত উপস্থাপিত হয়েছে ‘ঢাকায় শরৎচন্দ্র’ শীর্ষক প্রবন্ধে। অন্যদিকে সুবিখ্যাত দ্য বেঙ্গল অ্যাটলাসের নির্মাতা সার্ভেয়ার জেমস রেনেলের ঢাকার জীবন নিয়ে আলোচনা রয়েছে ‘জেমস রেনেলের ঢাকার দিনগুলি’তে।

‘বিদ্যাসাগরের লুপ্তপ্রায় গ্রন্থাগার’ লেখাটি একটু ভিন্ন ধাঁচের। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শুধু নিজের স্বল্প পুঁজি ও বাঁধাধরা আয় সম্বল করে কীভাবে একটি বিরাট গ্রন্থাগার গড়ে তুলেছিলেন এবং পরে তা কী করে নানা পথ ঘুরে আদালতের আদেশে নিলামে উঠল সেই কাহিনি এখানে লেখক শুনিয়েছেন। ‘আগলে বসে রইব কত আর’ প্রবন্ধটিতে মিলবে তিনটি যুগান্তকারী প্রতœতাত্ত্বিক খননের নেপথ্য কাহিনি। উনিশ শতকে রাজশাহী জেলার তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট মেটকাফের বাংলার সেন বংশের তথ্যসংবলিত শিলালিপির সন্ধানলাভ, ভারতের বিশাল পথ পাড়ি দিয়ে মার্ক অরেলস্টাইনের হাজার বুদ্ধের গুহা আবিষ্কার ও কঠোর পরিশ্রমের পর সম্রাট অশোক-নির্মিত স্তম্ভলিপির পাঠোদ্ধার কীভাবে করলেন জেমস প্রিনসেপ ইতিহাসের স্বল্পজ্ঞাত অধ্যায় উন্মোচনের প্রয়াস নিয়ে রচিত এই আখ্যানত্রয় পাঠকদের মুগ্ধ করবে।



Buy this book from:



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *