নেচে ওঠে আদমের সাপ
বর্তমান সময়ের আলোচিত লেখিকা নাসরীন জাহান-রচিত ‘নেচে ওঠে আদমের সাপ’ গল্পগ্রন্থটি এক অনবদ্য সৃষ্টি। সাপ একটি বিষাক্ত প্রাণী, যার ছোবলে মাঝেমধ্যেই সংবাদমাধ্যমে বা নিজ কানে মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়; কিন্তু সাপ কি সাপরূপেই প্রকৃতিতে বিরাজমান? মানুষের মাঝে কি সাপ নেই? অবশ্যই আছে। চরিত্র বিশ্লেষণ করলে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের মাঝেও উত্তম-অধম সকল ধরনের প্রাণীকেই খুঁজে পাওয়া যায়। আর যখন মানুষের মাঝে অধম কোনো প্রাণী বিকশিত হয়, সে-প্রাণী কত মারাত্মকভাবে আবির্ভূত হয়, তা লেখিকা সুনিপুণভাবে তাঁর লেখনীতে প্রকাশ করেছেন এ-গ্রন্থে। মানুষের মাঝে যে বিষাক্ত সাপ রয়েছে, তা কতখানি বিষাক্ত, তা-ই যেন নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে এখানে।
‘নেচে ওঠে আদমের সাপ’ গ্রন্থটি মোট ১০টি ছোটগল্প ধারণ করে আছে। প্রথম গল্পটির শিরোনাম ‘গুম’। লেখিকা এখানে লেখনীর মায়াজলে পাঠকের সামনে হাজির করেছেন ইব্রাহীমকে। চরিত্রটির কোনো সুস্পষ্ট দৈহিক বর্ণনা না দিয়েই তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, পাঠক গল্পটি পড়ার সময় কল্পনার পৃথিবীতে ইব্রাহীমকে আঁকতে বাধ্য হবে। এ-গল্পে মানুষের মাঝে ঈর্ষা বা ক্রোধ কীভাবে সাপের মতো ফণা তোলে এবং কীভাবে তা মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে সেটারই এক উন্মুক্ত প্রতিফলন ঘটেছে। আমাদের দেশে মানুষ গুম হয়ে যাওয়া এবং আর না ফিরে আসা যেন নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে! এরকমই একটি কাল্পনিক তবে বাস্তবসম্মত ঘটনাকে আশ্রয় করেই এগিয়েছে গল্পটি। দ্বিতীয় গল্পের শিরোনাম ‘একটি মৃত্যু Ñ তার পরের অথবা আগের কথন’। এখানে বড় জটিল পরিবেশে লেখিকা বিশ্লেষণ করেছেন পুরুষের বিভিন্ন রূপ; আবিষ্কার করেছেন ভালোবাসার টান এবং তার প্রভাব। গল্পটি আবর্তিত হয়েছে সুরাইয়া, আবদুল্লাহ, জেসমিন এবং একজন অদৃশ্য মানুষকে কেন্দ্র করে। অদৃশ্য মানুষটা গল্পে প্রচ্ছন্নভাবে উপস্থিত থাকলেও সে যেন গল্পের প্রাণ। লেখিকা নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন পুরুষ যেমন চরিত্রহীনতার অতলে নামতে পারে, আবার এই পুরুষ সমাজেরই অনেকে হতে পারে ভালোবাসা আর মমতার মহান ধারক। একটি আত্মহত্যা কেন ঘটে, পরিজনের জীবনে তার প্রভাব কী, কীভাবে চেনা পৃথিবী একটা মানুষকে ধীরে ধীরে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয়, তার যেন পরিপূর্ণ চিত্র ফুটে উঠেছে এখানে। তৃতীয় গল্পটি ‘অরণ্যপ্রেমিকা যুগল’ শিরোনামে লেখা হয়েছে। এখানে লেখিকা সমকামী দুটো মেয়ের আত্মকথা যেন তুলে ধরেছেন। আমাদের সমাজব্যবস্থা, ভাগ্য মেয়ে দুটোকে এক হতে দেয়নি; সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে একজনের জীবন! এবং এই বিচ্ছেদ জীবিত অপরজনকে কীভাবে কুরে কুরে খেয়েছে, সেটাই বর্ণিত হয়েছে এ-গল্পে। চতুর্থ গল্পের শিরোনাম ‘রক্ত-খোয়াবের চক্করে’। এখানে নিখুঁতভাবে কিছু জটিল ব্যাপারের সরল প্রকাশ ঘটিয়েছেন নাসরীন জাহান। একজন অপ্রকৃতিস্থ শিশুর জীবন কেমন হয়, সেই শিশুর পরিবার কীভাবে দিনাতিপাত করে, সেসবেরই প্রশস্ত প্রকাশ ঘটেছে এখানে। সেইসঙ্গে সমাজের কিছু সমস্যাও তুলে ধরা হয়েছে। ‘প্রচ্ছন্ন প্রভাবের তোড়’ শিরোনামে লেখা হয়েছে পঞ্চম গল্পটি। প্রতিটি মানুষের জীবনে জটিলতা থাকে, থাকে প্রকাশিত বা অপ্রকাশিত কষ্ট। সকল মানুষ মনে করে তার কষ্ট পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কষ্ট। গল্পটি নিশি এবং মমতা নামে দুজন মানুষের কথোপকথনের মাধ্যমে উঠে-আসা স্মৃতিচারণের মাধ্যমে এগিয়েছে। লেখিকা এখানে প্রমাণ করেছেন, মানুষের মাঝে কষ্ট থাকলেও এবং আপন কষ্ট পৃথিবীর সেরা হলেও কষ্টের চেয়েও বড় কষ্ট আছে।
পাপ বাপকেও ছাড়ে না, ‘সান্ধ্যমুখোশ’ গল্পে লেখিকা এ-কথাই যেন প্রমাণ করলেন। কোনো এক দুর্বল সন্ধ্যায় এক কিশোরীকন্যা ধর্ষণের শিকার হয় নিতান্ত এক ভদ্রলোকের দ্বারা। খুব ঠান্ডা মাথায় ধর্ষণ করে মৃত্যু নিশ্চিতপূর্বক লোকটা গুম করে ফেলে লাশ। সবকিছু ধামাচাপা দিলেও খুব বেশিদিন সে তার কৃত পাপ চেপে রাখতে পারেনি। অপর কোনো এক বিদ্যুৎ-সন্ধ্যায় সে নিজের অজান্তে স্বীকার করে নেয় আপন পাপ। ঘটনা বর্ণনায় লেখিকা যেমন বাস্তবতাকে তুলে এনেছেন, ঠিক একইভাবে পরাবাস্তবতাকেও প্রমাণ করেছেন। ‘নিমতলী থেকে উড়াল চিঠি’ একজন মুক্তিযোদ্ধার গল্প, যিনি মরণপণ যুদ্ধ শেষে ফিরে এসে দেখেন তাঁর ভিটেমাটি গ্রাস করেছে ভূমিদস্যু। ভাষা-আন্দোলনের চেতনামুখর অষ্টম গল্পটির শিরোনা ‘সোনা মিয়া’। এ গল্পে লেখিকা বেশ খোলামেলাভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন, এদেশের যেসব মানুষ নামের পিশাচ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চেয়েছিল, এদেশের স্বাধীনতা চায়নি, তারা এবং তাদের বংশধর এখনো সোচ্চার দেশের স্বাধীনতা হরণে। নবম গল্পটির শিরোনাম ‘কী ভেবেছিলে? না ভেবেছিলে…’। এখানে মানুষের ধর্মচিন্তা, ভালোবাসায় ধর্মের অবস্থান, নিমতলী ট্র্যাজেডি, আধুনিক যুগীয় প্রেম-ভালোবাসার আসল রূপ, মানবতাবোধ তুলে আনা হয়েছে নিখুঁতভাবে। সর্বশেষ গল্পটির শিরোনাম ‘প্রেমের সীমা পরিসীমাহীন মন চক্কর’। রূপা চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখিকা এখানে নারীচরিত্রের এক দুর্বোধ্য দিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। নারীচরিত্র কতখানি দোদুল্যমান, সেটাই যেন এ-গল্পের প্রতিপাদ্য। ‘নেচে ওঠে আদমের সাপ’ গল্পগ্রন্থে লেখিকা এখানে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে এবং সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন সমাজের ছোট-বড় অসংগতি, জাতীয় জীবনের ক্লেষ, মানব হৃদয়ের হাহাকার। সহজ-সরল এবং সাবলীল কাব্যিক ভাষায় গদ্য রচনার এক অনিন্দ্যসুন্দর উদাহরণ এ-গ্রন্থ।
